রবিবার, ২৪ আগস্ট, ২০১৪

বিধিবাম


বিধিবাম
আতিক রাসেল
খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো
বর্গী এলো দেশে
বুল বুলিতে ধান খেয়েছে
খাজনা দেবে কিসে।
ঐ দেখ বাবুর মা বাবুকে ঘুম পাড়াচ্ছে। কি সুন্দর কন্ঠ তার সারা দিন গান গায়।
হ-বুবু ওর কন্ঠটা খুব সুন্দর কিছু একটা গাইলেই সুন্দর গান হয়ে যায়। কিন্তু বেচারার গানের বিষয় ঐ একটাই
খোকন খোকন ডাক পাড়ি
খোকন গেল কার বাড়ি
আয়রে খোকন ঘরে আয়
দুধ মাখা ভাত কাকে খায় ।
খোকন খোকন ডাকে মায়
খোকা বাবুর দেখা নাই
খোকান সোনা কাছে নাই
মায়ের মনে শান্তি নাই।

খোকন ছাড়া ও বেচারা আসলে কিছু বোঝেনা। বাবুর মার প্রথম যখন বিয়ে হয়েছিল তখন ও কত গান গাইত সন্ধ্য হলে বাড়ির মহিলা সবাই এক সাথে আসর জমাত। বাবুর মার গান শোনার জন্য পাশের বাড়ির মহিলারা ও ভীড় করত।
দুর্ভাগ্য বেচারীর প্রথম সন্তানটা মৃত অবস্থায় জম্মে ছিল তার পর থেকে বাবুর মা কেমন জানি নিজের মধ্যে লুকিয়ে যায়। আগের মত হাসেনা কথা বলে না । গান গায়না । দ্বিতীয় সন্তানটি জম্মের পর ওর মুখে কিছুটা হাঁসি ফুটেছিল কিন্তু তাও বেশী দিন টেকেনি। পানিতে পড়ে দ্বিতীয় সন্তানটি মারা যাবার পর বাবুর মা প্রথম অবস্থায় তিন দিন বেহুশ ছিল সাত দিনের মধ্যে দানা পানি মুখে নেয় নি। সন্তানের জন্য মানুয়ের মায়া থাকে কিন্তু বুবু এত বেশী মায়া থাকতে আমার জীবনে দেখিনি।
সন্তানের জন্য তার বেশী মায়া এ জন্যই হয়তো তার সন্তান বাঁচেনা। বাবুর মাকে নিয়ে কথা হচ্ছে মাফরুহা এবং মরিয়মের মধ্যে। মাফরুহা , মরিয়ম এবং বাবুর মা তিন জন সম্পর্কে জা। পাশা পাশি ঘর। বাবুর মা প্রথম যখন এই বাড়িতে এসেছিল তার হাসি খুশি ব্যবহার এবং সুন্দর আচরণ দিয়ে সবার মন জয় করে নিয়েছিল। যদি ও এখন সবার সাথে তেমন একটা মিশেনা কিন্তু তার জন্য কেন যেন সবার মায়া হয়। বাবুর মার তৃতীয় সন্তান অর্থাৎ বাবুর জম্ম হয়েছে আজ একমাস। সারাদিন ছেলেটাকে বুকের মধ্যে আগলে রাখে। এক মুহুর্তের জন্য চোখের আড়াল হতে দেয়না এইটুকু ছেলে তার গান বোঝে কিনা কে জানে। কিন্তু সে সারাক্ষণ বাবুকে গান শোনায়। তার গান না শুনলে নাকি বাবু ঘুমায় না।
বাবু আস্তে আস্তে বেড়ে উঠতে থাকে বাবুর বয়স এখন এক বছর এইটুকু ছেলে কি বোঝে? ওর মা ছাড়া ও আর কারো কোলে যায় না। মরিয়ম মা ফরুহারা মাঝে মাঝে বাবুকে কোলে নিতে চায় বাবু চিৎকার দিয়ে মায়ের কোলে ঝাঁফিয়ে পড়ে। সবাই বলে ছেলেটা হয়েছে একেবারে মায়ের মত মা যেমন ছেলে ছাড়া কিছু বোঝেনা ছেলেটাও তেমনি মা ছাড়া কিছু বোঝেনা বাবুকে নিয়ে বাবুর মায়ের আনন্দের সীমা নেই মাঝে মধ্যে মাফরুহা দেরকে বলে দেখ ভাবী ছেলেটা আমার মত হয়েছেনা দেখতে? ঐ দেখ আমার নাক ,আমার চোখ সব কিছু প্রায় আমার মত তাই না ভাবী? সবাই বলে হ্যাঁ। আমার ছেলের সব কিছু আমার মত। কন্ঠটা ও আমার মত হবে আমার ছেলেকে আমি গান শেখাব আমার ছেলেকে আমি আলেম বানাব ও বিরাট বক্তা হবে হাজার হাজার মানুষ ধ্যান মগ্ন হয়ে ওর ওয়াজ শুনবে। ওর ওয়াজ শুনে শত শত কাফির মুসলমান হয়ে যাবে।
বাবুর বয়স পাঁচ বছর বাবু খুব ভালো কোরআন ও তেলাওয়াত করে। বাবুর মার বুকটা খুশিতে ভরে উঠে। বাবু মাদ্রাসায় যায় বাবুকে ক্লাশে দিয়ে বাবুর মা মাদ্রাসার বাইরে অপেক্ষা করে। মাঝে মাঝে গেটের ভেতর দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে বাবুকে দেখা যায় কিনা। বাবু ক্লাশের ভেতরে সে জানে বাবুকে দেখা যাবে না তবুও বার বার কøাশের দিকে তাকায়। মনটা কেমন অস্থির হয়ে উঠে।
টুন- টুন- টুন- টুন – ছুটির ঘন্টা বেজে উঠে আর বাবুর মার মনটা আনন্দে ভরে উঠে দ্রুত গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে বাবু দৌড়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে বাবুকে বুকে জড়িয়ে ধরে মার বুকটা ভরে যায়। বাবুকে নিয়ে দ্রুত বাসায় চলে আসে। বাবুর জন্য সারি সারি খাবার নিয়ে আসে বাবু খায়। একসময় বাবুর পেটে আর জায়গা থাকে না তবু ও বাবুর  মা বলে আর একটু খা বাবা। লক্ষী বাপ আমার ,সোনা আমার, কত রকম সোহাগ করে বাবুকে খাওয়ায়।
বাবুকে পেয়ে বাবুর মা আবার তার স্বরূপ ফিরে আসে বাড়িতে মাঝে মাঝে সন্ধার পর আসর জমে। মা ছেলে গান গায় সবাই মন্ত্র মুগ্ধ হয়ে শোনে। শরতের মেঘ মুক্ত আকাশে চাঁদনীটা বেশ মনকাড়া বাবুর মা মাঝে ,মাঝে ছেলেকে নিয়ে উঠানে বেরোয়। চাঁদনী রাতে দু’জনে গান গায়। ঘরের সিঁড়িতে বসে বসে গল্প বলেন। ছেলেকে ইসলামী মন মানসিকতা গড়ে তোলার জন্য সাহাবীদের গল্প বলেন। ইসলামী আন্দোলন  জন্য যারা যুগে নিজের জীবন দিয়ে গেছেন তাদের জীবনী বলেন।
বাবু এখন ক্লাশ ফাইভেট পড়ে। মাদ্রাসায় সেরা ছাত্র সে পড়ালেখা , খেলাধুলা , সবক্ষেত্রেই সফল সে। এইটুকু ছেলেটার মনে কি যে খেলা করে কে জানে। মাঝে মধ্যে চাঁদনী রাতে দেখলেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে সে। চাঁদনী রাতে তাকে অসম্ভব কাছে টানে। আল্লাহর এই অপরূপ সৃষ্টির দেখে বোধ হয় সে মুগ্ধ হয়। একদিন এমন চাঁদনী রাতে উঠোনে হাঁটতে থাকে সে। চাঁদের দিকে তাকিয়ে ইসলামী সঙ্গীঁত গাইছে আর আনমনে হাঁটছে।
বলতো রাতের আকাশ
কার প্রেমে জোৎসনা ঝরায়
বলতো রাতের তারা
কার প্রেমে হাসলো ধরায়
বলতো ..........
হঠাৎ তার চোখে পড়লো কি যেন একটা চাঁদের আলোয় চিকচিক করছে। বাবু কাছে গেল। একটু পরেই মাগো বলে বাবু চিৎকার!.. ঘর থেকে একটা শব্দ হলো বাবুর মার হাত থেকে কাঁচের কি যেন একটা পড়ে ভেঁঙ্গে গেল দৌড়ে আসতে গিয়ে বারান্দায় পড়ে গেলেন বাবুর মা আবার উঠে আসলেন। এতক্ষণে গোখরা সাপটি মাথা নিচু করে বলে যাচ্ছে সাপ ....বাবু...... এই দুটি চিৎকার   খুব জোরে শোনা গেল মা ছেলে দু’জন অজ্ঞান হয়ে উঠানে পড়ে আছে। ডাক্তার ওঝা বৈদ্য অনেকেই আসলো বাবুর মা বাঁচলো কিন্তু  বাবুকে বাঁচানো গেলোনা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন