আতিক রাসেল
চল ভাইয়া চলনা,পাখিটা কোন দিকে যায় দেখি
চলনা ভাইয়া চল।
আমি এখন যেতে পারবোনা তুই যা।
সাঈদ না গেলে নিজে একাই পাখির পেছনে পেছনে যায় আনাস। অনেক দিন ধরেই তার একটা টিয়া পোষার শখ। সব পাখি তার পছন্দ না তার চাই একটা টিয়া পাখি। কিন্তু এই টিয়া গুলো থাকে কোথায় ? মাঝে মাঝে দেখা যায় দল বেঁধে টিয়া পাখি আসে টিয়া পাখি দেখলেই পেছনে লাগে আনাস। নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও এদের বাসা আছে। আনাসের ধারণা আশে পাশে কোথাও না কোথাও এদের বাসা আছে।
অনেক দিন ধরে খুঁজে ও সে এদের বাসার সন্ধান পায়নি। এক সাথে দল বেঁধে কোন দিকে যে এরা চলে যায় সেটা বুঝতে পারেনা আনাস। সে এবং তার বড় ভাই সাঈদ দুজন মিলে কয়েকদিন এদের বাসা খুঁজেছিলো। এখন আর সাঈদ যেতে চায়না। সাঈদদের ধারণা টিয়া পাখি গুলো বাসাই বাঁধেনা।
আনাস তবু ও আশা ছাড়েনি একদিন আনাস এসে সাঈদকে বলল ভাইয়া টিয়া পাখির বাসা খুঁজে পেয়েছি। সাঈদ খুঁশি হয়ে বলে কোথায় ? চলতো দেখি। দু’জন পাশের বাড়িতে যায়।
আনাস বলে ঐ যে বড় তুলা গাছটায় একটা গর্ত দেখা যাচ্ছে এখানে একজোড়া টিয়া পাখি থাকে।
সাঈদ প্রথমে বিশ্বাস করতে চায়নি। হঠাৎ করে গর্ত থেকে যখন একটা টিয়া পাখি বেরুল তখন সে ঠিক বুঝলো এই গর্তে টিয়া পাখি থাকে।
কিন্তু গাছটাযে অনেক বড় তার উপর কাঁটাও আছে। কিভাবে টিয়ার বাচ্ছা নেবে বুঝতে পারেনা তারা। ওই বাড়ির কাজের ছেলে রফিক এসে বলে Ñআনাস ভাই কী খুঁজছেন ?
ঐগাছে টিয়া পাখির বাসা আসে। যদি একটা টিয়ার বাচ্ছা নিতে পারতাম।
রফিক বলে Ñটিয়া পাখি গুলোর তো এখানে বাচ্ছা ফোটেনি। কিন্তু তুমি কিভাবে জান যে এদের বাচ্ছা ফোটেনি ?
রফিক বলে Ñআনাস ভাইয়া টিয়া পাখি গুলোর যখন বাচ্চা ফুটবে তখন ওরা মুখে খাবার নিয়ে বাসায় ঢুকবে।
সাঈদ বলে সত্যিইতো এটা তো আমাদের মাথায় আসেনি। তারপর থেকে মাঝে মাঝে আনাস এবং সাঈদ এসে টিয়া পাখির বাসাটা দেখা যায়। একদিন সত্যি সত্যি আনাস দেখে টিয়া পাখি গুলো মুখে খাবার নিয়ে বাসায় আসছে। আনাস দৌড়ে গিয়ে সাঈদকে বলে ভাইয়া টিয়ার বাচ্চা ফুটেছে। শুনে সাঈদ ও আনাস সাথে সাথে টিয়া পাখির বাসা দেখতে আসে। সাঈদ দেখে সত্যিই টিয়া মুখে খাবার। দু’জনে মহা খুশি তাহলে টিয়ার বাচ্ছা ফুটেছে। সাঈদ বলে কিছু দিন যাক টিয়ার ছানা গুলো একটু বড় হোক নইলে এদের বাঁচানো যাবেনা। আসার সময় ওরা ভাবে এত বড় গাছে উঠবে কি ভাবে?
রফিক বলে ভাই ঐগাছে উইঠেন না। শুনেছি গর্তে নাকি সাপ টাপ থাকে। আনাস চিন্তায় পড়ে যায়। সত্যিই কি ঐগর্তে সাপ আছে।
সাঈদ বলে শুধু শুধু চিন্তা করিসনা। ঐ গর্তে যদি সাপ থাকতো তাহলে তো টিয়া পাখিকে কামড়ে মেরে ফেলতো। টিয়া পাখি গুলো এখানে জীবিত কেন?
আনাসের মুখে হাঁসি ফোটে তাহলে গর্তে সাপ নেই। আনাস এখন প্রত্যেক দিন গাছের নিচে অন্তত দু বার বার আসে। দিন যেন কাটতে চায়না করে বাচ্চা গুলো বড় হবে।
১৫/১৬ দিন পর সাঈদ বলল এবার বাচ্চা গুলো নিতে পারিস এখন নিশ্চয়ই গুলো বড় হয়েছে। আনাস সিন্ধান্ত নিল সে উঠবেই বাধা দিতে চেয়ে ও বাধা দেয়নি সাঈদ শুধু বলল- সাবধানে উঠিস তুলা গাছ খুব বিপদ জনক। আনাস উঠলো গর্তে হাত দিয়ে বলল-ভাইয়া তিনটা বাচ্চা দুইটা থাক একটা নে সাঈদ ভাবলো টিয়া গুলো যদি বাসায় এলে কোন বাচ্চা দেখতে না পায় তাহলে ওদের খুব কষ্ট হবে। তাই সে একটা বাচ্চা নিতে বলল।
বাসায় এলে দু’জন মহাখুশি। বাঁশের একটা খাঁচা ছিল ঐ খাঁচায় টিয়া পাখিটির রাখল তারা। টিয়া পাখি কি খায়? রফিক বলেছিল দুধ কলা দিয়ে ভাত খাওয়ালে নাকি, টিয়া পাখি কথা বলে তাই তারা দুধ কলা দিয়ে টিয়া পাখিটিকে খাবার দিল।
কিন্তু তাদের দুধ কলা টিয়ার একটু ও পছন্দ হলো না । সে বাঁশের খাঁচাটি কাটতে শুরু করল। যেই শক্ত ঠোঁট এদেখি খাঁচা কেঁটে বের হয়ে যাবে চিন্তায় পড়ে আনাস। কোন রকমে একদিন পাহারা দিয়ে রাখা হল টিয়া পাখিকে।
পরদিন পুরনো ছাতা দিয়ে বাজার থেকে খাঁচা বানিয়ে আনলো আনাস। এবার টিয়া পাখি ইচ্ছে করলে খাঁচা কাঁটতে পারবে না। কিন্তু টিয়া সবার উপর প্রচন্ড রাগ করে। তাকে খাবার দিতে গেলে হাত কামড়ে দেয়। কাউকে দেখলেই কামড় দিতে চায়। কি সুন্দর একটা পাখি। আনাসের মনে পড়ে রূপকথার সেই সোনার খাঁচায় বন্ধি টিয়া পাখির কথা বলবে। রফিক বলেছিল টিয়াকে নাকি প্রথম প্রথম শিষ দেয়া শিখাতে নিজেই শিষ দেয়ার চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু পাখিটি শুধু জনা ঝপাটায় তার শিষ একটু ও শুনতে চায় না।
সাঈদ বলে তোর শিষ শুনে পাখিটার ঘেন্না লাগে। তুই শিষ দিতে পারিসনা। যা আমি শিষ দিচ্ছি । আনাস বলে না তুমি যাও আমি শিষ দেব তুমি শিষ দিলে পাখিটা শেষে তোমার ভক্ত হয়ে যাবে আমার ভক্ত হবে না।
টিয়া পাখিটাকে নিয়ে আনাসের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। পাখিটা যত খাক না কেন আনাসের কেন জানে মনে হয় যতই দিন যাচ্ছে ততই পাখিটার স্বাস্থের অবনতি হচ্ছে। কিন্তু পাখিটা স্বাস্থের উন্নতির বদলে অবনতি হচ্ছে কেন? দুধ কলা খেয়ে ও পাখিটার মোটা তাজা হচ্ছেনা কেন? তার কি মা-বাবা,ভাই-বোনের কথা মনে পড়ছে ইত্যাদি নানা প্রশ্ন যাগে আনাসের মনে।
রফিক বলেছিল কিছু কিছু টিয়ার নাকি জম্মের সময় কান ফুটেনা। জম্মের এক থেকে দেড় মাস পর কান ফুটে।
কান ফুটতে পাখির ভীষণ কষ্ট হয়। অনেক পাখি তখন মরে যায়। বেশীর ভাগ পাখির কান ফুটে রাতের বেলায়।
পাখিটির বয়স প্রায় একমাস হতে চলল। আনাস মাঝে মাঝে রাতে ঘুম থেকে উঠে পাখিটাকে দেখে যায়। বিড়াল দেখে যদি পখি ডান ঝাপটায় সে তাড়াতাড়ি পাখির খাঁচার পাশে চলে আসে।
এভাবে প্রায় দু’মাস কাটলো আনাস এখন মোটা মুটি নিশ্চিন্ত যে তার টিয়াটি তাহলে এ যাত্রায় বেঁচে গেল।
পাখিটি আস্তে আস্তে কেমন যেন নিশ্চুপ হয়ে যায়। আগের মত খাঁচা কাঁটার চেষ্টা করে না । যা দেয় তাই খায় । খাঁচার মধ্যে এদিক সেদিক ঘোরে ফেরা করে।
আনাস তার আম্মুকে বলে আম¥ু পাখিটা আগের মত চলে যেতে চায় না কেন?
তার আম্মু বলে পাখিটার এসব সয়ে গেছে। দীর্ঘ দিন বন্ধী থাকতে থাকতে এখন সে এই খাঁচাটিকেই তার পৃথিবী ভাবে। তাই সে এখন আর বাইরে যেতে চায় না। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে নফস দিয়েছেন। নফসের চাহিদা অনেক কিন্তু আল্লাহ তায়ালা হালাল হারামের একটি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়ে দিয়েছেন। যারা নিজেদের নফসকে ¯্রষ্ঠার বেঁধে দেয়া গ-ির মধ্যে রাখতে পারেনা তারা নফসের অনুগত হয়ে যায়।
নফস প্রথম প্রথম অনুগত থাকেনা। যদি কিছু দিন কষ্ট করে অনুগত রাখা যায় তাহলে সে এই পখিটির মতই বাধ্য হয়ে যায়।
তার মা আরো বললেন পাখিটির এখনে ছেড়ে দিলে ও সে আবার ওই খাঁচায় চলে আসবে। খাঁচাটাই এখন তার পৃথিবী।
একদিন সত্যি সত্যিই আনাস পাখির খাঁচার মুখ খুলে দেয় পাখিটি খাঁচা থেকে বের হয়। সারাঘর পায়চারি করে। আবার নিজেই এসে খাঁচার মধ্যে বসে থাকে।
পাখিটি একসময় আনাসের ভীষণ ভক্ত হয়ে যায়। আনাস যেখানে যায় পাখিটি ও তার সাথে সাথে যায়। হাত বাড়ালে পাখিটি তার হাতে এসে বসে। আনাসের মা ওকে বলল আবুল বাব্বাগা।আনাস বলত আবুল বাব্বাগা মানে ও টিয়ার বাপ না। টিয়ার মালিক। তোমার আমাকে আবুল বাব্বাগা ডাকলেও আমি রাগ করবোনা।
আনাসের মা বলে দেখছিস এই পাখিটির তার মালিকের জন্য কেমন মায়া। তুই বাড়িতে ফিরলেই উড়ে তোর কাছে চলে যায়। অথচ যেই আল্লাহ আমাদেরকে সবাইকে সৃষ্টি করেছেন তার প্রতি কি আমাদের এতটুকু মায়া আছে?
আমরা কি তার আদেশ নিষেধ ঠিক মত মেনে চলি। এই পাখিটি থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিত।
একদিন রাতে হঠাৎ পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ আনাস ছুটে আসে পাখির খাঁচার দিকে। এসেই দেখে পাশের বাড়ির কালো বিড়ালটি তার প্রিয় পাখিটিকে কাঁমড়ে ধরেছে আর পাখিটি বাঁচার জন্য প্রাণপনে চেষ্টা করছে।
আনাসের চোখে মুখ ঝাঁপসা হয়ে আসে কোন রকম পাশ থেকে একটা লাঠি নিয়ে বিড়ালটিকে আঘাত করে সে।
টিয়াটিকে ছেড়ে বিড়ালটি পালায় কিন্তু যন্ত্রনায় ছটফট করতে থাকে তার অতি আদরের টিয়া পাখিটি।
আনাসের কান্নার শব্দে সবাই ঘুম থেকে জেগে উঠে। আনাসের মা তাকে সান্তনা দেয়। বলে সামান্য একটুু আঘাত করেছে। মরিচ দিয়ে সেঁকে দিলেই দু’তিন দিনেই মধ্যেই সেরে উঠবে। আনাস তার মাকে জড়িয়ে ধরে জোরে কেঁদে উঠলো ,মা সত্যিই সেরে উঠবে?
তার মা বলে ”হ্যাঁ সত্যিই সেরে উঠবে।
.jpg)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন