আতিক রাসেল
সকাল নাস্তা খেয়ে তড়ি ঘড়ি করে অফিসের পানে ছুটে। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। এভাবেই কেটে যায় সাপ্তাহের ছয়টি দিন। শুত্রুবার অফিস ছুটি সেদিন সারাটা দিন ঘুমের বরাদ্ধ কোথাও বেরুতে ইচ্ছে করে না। মাঝে মাঝে বসের ফোন আসে শুত্রুবারে অফিসে আসতে হবে জরুরী কাজ আছে। এভাবে কাটে পরশের সাপ্তাহের সাতটা দিন।
তার স্ত্রী নীলা স্বামীর অফিসের যাবার পর ছেলেকে স্কুলের জন্য প্রস্তুত করে দেয়। ছেলে চলে যাবার পর টিভির সামনে বসে। কিন্তু মনটা ফ্রেশ হবার বদলে আরো এলোমেলো হয়ে যায়। এক সময় বিছানায় শোয় ঘুম হয় না। কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে উঠে যায় এভাবে কাটে তার এক ঘেয়ে বিষাক্ত জীবন। গ্রামের দুরন্ত দশ্যি মেয়ে নীলা। বিয়ের পর স্বামীর সাথে ঢাকায় চলে আসে। ঢাকা শহরের এই আবদ্ধ জীবন তার এক ধম ভালো লাগেনা। কিন্তু স্বামী সংসারকে ভালোবাসে বলেই মানসিক ত্যাগ স্বীকার করে তাকে থাকতে হচ্ছে। এই প্লাটে তার ঘোরার জায়গা দুটো একটা বেলখনি আর অন্যটি ছাদ। মাঝে মাঝে চাঁদনী রাতে পরশকে নিয়ে ছাদে যায়। বালিকা মেয়ের মত দৌড়ে দোড়ি করে এই প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। গতরাতে তারা দু’জন ছাদে গিয়েছিলো। হঠাৎ কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেল নীলা। পলাশ বলল কি হয়েছে? ঐ দুরের বিল্ডিং গুলোর দিকে তাকিয়ে দেখ। ঠিক আমাদের গ্রামের কবুতরের বাসার মত না? এই কবুতরের বাসা গুলোর ভেতর আমাদের মত মানুষেরা থাকে বাহ কি মজার তাই না? কবুতর গুলোর তো তাও পাখা আছে ইচ্ছে হলে হারিয়ে যায় দুর আকাশের সুদুর নীলিমায়। আমাদের তো তাও নেই।
মাঝে মাঝে এরকম কথা বললে পরশ বুঝতে পারে ওর গ্রামের কথা মনে পড়ছে। তখন এটা ওটা বিভিন্ন জোকস টোকস বলে ভুলিয়ে রাখে অনেকটা বাচ্চাদের বৌয়ের মন খারাপ দেখে বেড়াতে যাবার ঘোষনা দেয়। পরশ আগামী কাল শুত্রুবার তারা তিন জন মিলে বেড়াতে যাবে। স্থান ঠিক হয় ফ্যান্টাসি কিংডম।
সারা রাত নীলার সে কি উচ্ছাস। ছেলেকে ঘুম পাড়ানোর সময় সে ছেলেকে ফ্যান্টাসি কিংডম কথা বলে। আগামী কাল তারা ফ্যান্টাসি কিংডম যাচ্ছে। মায়ের কাছে ফ্যান্টাসি কিংডমের বিস্তারিত বিবারণ শুনে অনেক খুশি হয় সৌরভ। সারা রাত তার ঘুম হয় না মাঝে মাঝে দু’চোখের পাতা একত্রিত হয়। আর তখনই ভেসে আসে মজার মজার নানান দৃশ্য।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই পরশ বলে । আমাকে অফিসে যেতে হবে বস কল করছে। তারা রেড়ি হও আমি তাড়াতাড়ি ফিরে আসবো।
সকাল আটটায় অফিসের পানে ছুটে পরশ। উদ্দেশ্য যত তাড়াতাড়ি অফিসে পৌছে যায়। কাজটা সেরেই বাসায় চলে আসবে সে। কিন্তু আজ কোন গাড়ি থামছেনা কেন? ঐতো লোকাল গাড়ি হাত দেখালেই থামবে। কিন্তু লোকাল গাড়িটা থামলোনা। আজ নাকি লোকাল গাড়ি গুলো সিটিং হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে এই সিটিং বিপাদে পড়তে হয় তাকে। অগত্যা হেটে বাসস্টেশনে আসে সে। কত গুলো গাড়ির সামনে লেখা লোকাল সিটিং। সিটিং শব্দটা আজ কেন যেন তার কাছে খুব নোংরা মনে হয়। তার খুব ইচ্ছে করে বাংলার লেখা সিটিং শব্দটাকে ইংরেজীতে ঈযবধঃরহম লিখে দিতে। চোখে মুখে বিরক্তির চাপ নিয়ে অবশেষে একখানা লোকাল সিটিং গাড়িতে উঠে পরশ।
কিছু দুর যেতে সিটিং গাড়িটি আর সিটিং থাকে না। অনেক লোকই দাঁড়িয়ে থাকে। বাসের মধ্যে এক বয়স্ক ভ্রদ্রলোক গর্জে উঠেন। ঐব্যাটা ভাড়া কিন্তু লোকালের পাযি। দাঁড়িয়ে লোক নিচ্ছিস কেন?
হেল্পারের কঠিন জবাব সিটিং ভাড়া দিতে হবে আপনি চাইলে নেমে যেতে পারেন। ভ্রদ্রলোক রেগে গিয়ে চেচামেচি শুরু করে দেন। ব্যাটা তোর এত সাহস তুই আমাকে নেমে যেতে বলিস। জানিস আমি কে? তুই আমাকে চিনিস? কিছুক্ষণ চেচামেচির পর অবশেষে কয়েকটি চড় থাপপড় দিতে চেয়ে তিনি কান্ত হনেন। কিন্তু একি হেল্পার ভাড়া পচ্ছে গতকালের ঠিক দ্বিগুন, কারণ দুটো প্রথমত সিটিং গাড়ি , দ্বিতীয়ত তেলের দাম বাড়ছে। পরশের পাশের সিটে বসা লোকটি তাকে উদ্দেশ্য করে বলে, বুঝেছেন ভাই। এ হচ্ছে আরেক ঝামেলা সাপ্তাহ না ঘুরতেই তেলের দাম বাড়ে। সরকার প্রতি লিটারে দুই টাকা বাড়ালে গাড়ি ভাড়া প্রতি কিলোতে দুই টাকা বাড়ে। কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে নির্বিকার ভোগান্তি আমাদের সাধারণ জনগনের। আমাদের বেতন তো আর ওভাবে বাড়ে না।
পরশের কানে এখন কোন কথাই যাচ্ছে সিটিং ভাড়া দিয়ে হলেও তাকে তাড়াতাড়ি অফিসে পৌছতে যত শীঘ্রই সম্ভব আবার বাসায় ফিরতে হবে ।
অফিসে এসেই দ্রুত কাজ গুলো সেরে নিচ্ছে সে। এদিকে নীলা ছেলেকে ¯স্নান করিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে। নিজেও বেশ যত্ন সহকারে সেজেছে। কয়েকদিন পর আজ তারা বেরুচ্ছে।
ফোন বেজে উঠে পরশের।
হ্যাঁ, নীলা আমি আসছি। আশ্বস্ত হল নীলা অফিস থেকে অবসর হতে পেরেছে পরশ আজ তাহলে সত্যিই বেড়াতে যাওয়া হচ্ছে। অফিস থেকে বেরিয়ে আবার গাড়ি খোঁজ করতে থাকে সে এবারে খুব বেশী সময় লাগলোনা গাড়ি পেতে। কিছুদুর যেতেই সে দেখতে পেল সমনে বিশাল জ্যাম। জ্যাম ছাড়ছেনা। দুপারের ভেজদ্বীপ্ত সূর্য মহাশয় তার তেজ ছড়িয়ে যচ্ছেন। অনেকেই গাড়িতে ছটফট করছেন। জ্যামের কারনে যতটা অস্থির লাগছে উৎকন্ঠার কারনে তা আরো দ্বিগুন হয়ে যাচ্ছে।
পাশে বসে থাকা একজনকে এই জ্যামের কারণে জিজ্ঞেস করে কোন সন্তোষজনক জবাব পায়না সে। বাসা থেকে ফোন আসলো। রিসিভ করতেই ছেলের কন্ঠ স্বর। বাবা তুমি কোথায়? এইতো বাবা আমি গাড়িতে। জ্যামটা ছাড়লে এসে পড়বো। অস্থির হয়ে আছে বাবা মা ছেলে তিনজন। অস্থিরতার প্রহর গুলো দীর্ঘতার হচ্ছে। কয়েক জনকে জিজ্ঞেস করার পর অবশেষে সে জানতে পারলো প্রধাণমন্ত্রী গাড়ি বের হচ্ছে তাই তাদের রাস্তাটা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সামনের রাস্তাটা পুরাপুরি ফাঁকা। এ রোড়েই বোধ হয় প্রধানমন্ত্রী বের হবেন। পরশ জানালা দিয়ে বার বার রোড়টির দিকে দেখে না। রোড়টা ফাঁকা পড়ে আছে। কেউই যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী তৈরী হতে সময় লাগছে হয়তো। জ্যাম দেখে পাখি গুলো ও বোধ হয় বিরক্ত ধরে গেছে। কাকগুলো কা-কা করছে মাঝে মাঝে ডানা ঝাপটাচ্ছে।
পাশে দুটো এ্যাম্বুলেন্স অনেক্ষণ ধরে কেঁদে যাচ্ছে। এ্যাম্বুলেন্সের কান্না একধম সহ্য হয় না তার। ইচ্ছে করে যে কোন উপায়ে এ্যাম্বুলেন্স গুলো পার করে দিতে।
ভেতরে রোগীটা কেমন আছে কে জানে। সামনে ফাঁকা রাস্তা দিয়ে দু’একটা গাড়ি যাচ্ছে। প্রধাণ মন্ত্রী বুঝি এই বেরুলেন। একটু সন্তনা পায় পরশ। কিন্তু না এখনো প্রধাণ মন্ত্রীর গাড়ি বের হয়নি। একটা এ্যাম্বুলেন্সর হর্ণ বন্ধ হয়। একটা জানালা খোলা হয়। রোগী বোধ হয় এতক্ষণে মারা গেছে। ভেতর থেকে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। হাসপাতালে আর যেতে হবেনা । এবার মরদেহটা তার আতœীয় স্বজনের কাছে পৌছে দিতে হবে।
সেনাবাহিনীর কয়েকটা মোটর সাইকেল চলে যেতে থাকে সামনের রাস্তা দিয়ে। তারপর একটা একটা করে প্রাইভেট কার যেতে থাকে। প্রধাণ মন্ত্রী চলে গেলে একসময় জ্যাম ছাড়ে।
দীর্ঘ চার ঘন্টা জ্যামে থাকার পর যখন বাসায় ফেরে তখন আর কোথাও বেরুনোর ইচ্ছে থাকেনা তার। দুপুরের খাওয়াটা তখনো বাকী। সবচেয়ে কষ্টদায়ক ব্যাপার হচ্ছে তার স্ত্রী বা ছেলে কেউই তার সাথে কথা বলেনা। পরশ ছেলেকে জড়িয়ে ধরে সান্তনা দেয়ার জন্য বলে। আগামী শুত্রুবার আমরা ঠিকই বেড়াতে যাবো দেখিস। কিন্তু ছেলেটা তাকে বিশ্বাস করেনা জোর করে নিজেকে জড়িয়ে নেয়।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন