ছদ্মবেশ
আতিক রাসেল
২৭ মার্চ, রাতের তান্ডব লীলার পর থমথমে দিন বিরাজ করছে। আবুল কালাম যুদ্ধে যাবে। বাঙ্গালী জাতির মুক্তির সংগ্রামে নিজেকে ও অংশীদার করবে সে। সংসারে তার বাবা মা ছোট ভাই আর একটি ছোট বোন। বড় ভাই আব্দুল মজিদ মাদরাসায় শিক্ষকতা করে। মুখ ভর্তি দাঁড়ি। দেখে অনেকটা পাকিস্তানী মনে হয় তাকে। যুদ্ধে যাবার জন্য আবুল কালাম বাড়ি থেকে বের হয়। বেরুনোর সময় বাবা-মা আর ছোট বোনটাকে বড় ভাই মজিদের কাছে রেখে যায়। এই বিপদের দিনে একজনকে বাবা মার পাশে থাকতে হবে। আর সেই মহান দায়িত্ব কাঁধে নেয় মজিদ।বাবা-মা আর ছোট ভাইবোনদের রক্ষা করার কৌশল খুজতে থাকে সে। পরদিন সে পাকিস্তানী ক্যাম্পে যায়। যোগ দেয় রাজাকার হিসেবে। পাক বাহিনীর সাথে ঘুরে বেড়ায় সারাদিন সন্ধার সময় বাসায় ফেরে একটি এল.এম.জি নিয়ে। রাজার হওয়ায় এটা তাকে পুরস্কার দেয়া হয়েছে । বাবা তার মুখ দেখে কেঁদে উঠেন কেঁদে উঠেন মাও। বাবার একটি কথা তার কানে অনেক্ষণ বাজে। আমার ছেলে রাজকার, আমার ছেলে রাজাকার ..........ছোট বোনটা শুধু মাটির দিকে একটু থুথু ফেলে মা বলেন আমার ছেলে রাজাকার একথা জানার আগে আমার মরণ হলো না কেন?
পরদিন পাকবাহিনীর সাথে একটি বাঙ্গালী বাড়িতে প্রবেশ করে মজিদ। তাদের ছেলে মুক্তিযোদ্ধা। নাম সজিব, পাকবাহিনী সজিবের বাবা মাকে জিজ্ঞেস করে তোমার ছেলে কোথায় ? তারা করুণ ভাবে জবাব দেন আমরা জানি না । হুংকার ছাড়েন সেনা প্রধান । একজন গিয়ে মহিলাকে ধরে নিয়ে আসে। মজিদ তার হাত থেকে মহিলাকে ছাড়িয়ে নিয়ে চড় থাপপড় লাথি মেরে অনেক্ষণ উর্দুতে গালাগাল করে। পুরুষটাকে অনেক আঘাত করে। সারা গ্রামে গুঞ্জন রটে যায় শরাফত আলীর ছেলে মজিদ একজন রাজাকার। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে অনেকই তাকে টার্গেটে রাখে সুযোগে ফেলেই এই রাজাকারটাকে পৃথিবী থেকে বিদায় করে দিতে হবে। রাতে বাসায় ফেরে মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম। তার বড় ভাই রাজাকার হয়েছে একথা কোন মতে বিশ্বাস করতে পারেনা সে। দুদিন আগে ও যার মুখ থেকে ঝরে পড়ে পকিস্তানীদের প্রতি ঘৃণা আর বিদ্রুপ সেই কিনা ....বড় ভাইয়ের কাছে মলিন মুখে জানতে চায় আবুল কালাম আসলে প্রকৃত ঘটনাটা কি? ছোট ভাইকে রাতের অন্ধকারে বাইরে নিয়ে যায় মজিদ। আস্তে আস্তে তাকে বুঝিয়ে বলে। সে নিজে ও মুক্তিযোদ্ধা হতে চায়। এক পরিবারে দুই ছেলেই মুক্তিযোদ্ধা একথা জানালে মিলিটারিরা তাদের বাবা মাকে মেরে ফেলবে এজন্য সে রজাকারের ছদ্মবেশ ধরেছে।
মজিদ বলে :Ñআমি আমার বাবা মাকে বাঁচাবো। আমি মুক্তিযুদ্ধ করব। আমি মুক্তিযুদ্ধ করব রাজাকার বেশে, দেখ আজকে যখন মুক্তিযোদ্ধা সজিবের বাবা মাকে মিলিটারিরা র্চাজ করছিল। তখন আমি ওদেরকে শারীরিক আঘাত করে গালাগালি করে ছেড়ে দিয়েছি। অন্তত ওদের জীবনটাতো বাঁচিয়েছি । আমি নিজে একজন প্রতিবেশীকে আঘাত করেছি। কিন্তু ওদের হাতে দিলে তো ওরা মেরেই ফেলতো। ওরা মানুষ না। আমি ওদের ক্যাম্পে গিয়েছি। আমি দেখেছি সেখানে বন্ধী মুুক্তিযোদ্ধাদের কতটা নির্মম ভাবে অত্যাচার করছে। সেই বিভৎস দৃশ্য দেখে ইচ্ছে করেছিল ওদের ক্যাম্পটা গুাড়িয়ে দেই। একটা কথা মনে রাখিস ওদের কাছে আত্মসমর্পন করার চাইতে আত্মঘাতী হামলা করা অনেক ভালো ।
শোন আগামী কাল পাকসেনারা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুর রাজ্জাকদের উপর হামলা করবে। তারা খবর পেয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল সুত্রাপুর গোড়াউনে অবস্থান করছে। তুই পারলে এক্ষুনি ওদেরকে সরে যেতে বল । সকাল বেলা আমি পাক সেনাদের নিয়ে সুত্রাপুর চলে যাবো ক্যাম্প তখন ফাঁকা থাকবে। এই ফাঁকে তোরা আত্রুমণ করে অস্ত্র সস্ত্র নিয়ে যাবি। ওদের পাহারাদার কোথায় কয় জন থাকে । অস্ত্র সস্ত্র কোথায় আছে সব বিস্তারিত বলে দিল সে।
পরদিন পাকসেনারা সুত্রাপুর গোড়াউনে প্রবেশ করলো সারা গুদাম সার্চ করে কোন মুক্তিযোদ্ধা পেলোনা । অবশেষে ক্যাম্পে ফিরে এসে দেখলো পাহারায় নিয়োজিত সদস্যদের লাশ আর লন্ড ভন্ড ক্যাম্পে। মনে হচ্ছে একটু আগে এর উপর দিয়ে মহাপ্রলংকরী কোন ঝড় বয়ে গেছে। মজিদ দীর্ঘ সময় ধরে অকথ্য ভাষায় মুক্তিযোদ্ধাদের গালাগালি করলো। পাকসেনারা বুঝতে পারলো মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি তার কি পরিমান ঘৃণা জমা আছে।
পরদিন আবার ট্রাকে ট্রাকে অস্ত্র আসলো সৈন্য সংখ্যাও বাড়ানো হলো। পাক-সেনারা আবার শুরু করলো তাদের জঘণ্যতম অভিযান। এক হিন্দু বাড়িতে ঢুকলো তারা। এ বাড়িতে আগের দিন একটি বিবাহ সংঘঠিত হয়েছিল। যুদ্ধের মধ্যের বিয়ে তাই তেমন কোন আনুষ্ঠানিকতা হয়নি বিয়েতে। হিন্দুদের প্রথা অনুযায়ী যে সমস্ত অনুষ্ঠানাদি না হলে নয় শুধু সে গুলোই হয়েছে। সবাই ভীত সন্ত্রস্ত বিয়ের কোন আমেজ নেই। ঘর থেকে ধরে আনা হলো নব বধু আর বরকে। ওরা জানত এটা হিন্দু বাড়ি। তবু ও মজা করার জন্য বরকে জিজ্ঞেস করল -তুমি হিন্দু নাকি মুসলমান সে কাঁপে কাঁপে স্বরে বলল -মুসলমান, কালেমা বল? সে চেষ্টা করল কিন্তু ঠিক ভাবে পড়তে পারলোনা অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো তারা । এক দানবীয় হাসির জোয়ার উঠলো। নব বধুর সামনে তার বরকে গুলি করে হত্যা করা হলো। মজিদের খুব ইচ্ছে হচ্ছিল লোকটাকে বাঁচানোর কিন্তু সে পারেনি। পাকবাহিনী চলে যাবার পর সে চুপি চুপি আবার এই বাড়িতে আসলো বিয়ের একদিন পরেই বিধবা হওয়া এক হিন্দু রমণীকে দেখতে যার সিঁথির সিঁদুর এখনো মুছেনি। অবিরাম কেঁদে চলছে মেয়েটি। তার অনেক স্বপ্ন সাধ চাওয়া পাওয়া সবই মুছে গেলো। মুহুতেই ভেঙ্গেঁ গেলো তার স্বপ্নের সংসার। চোখের পলকে নিঃশেষ হয়ে গেলো তার চাওয়া পাওয়া। হিন্দু সমাজে তখনো বিধবা বিবাহের তেমন একটা প্রচলন ছিলোনা। আদৌ কি আবার বিয়ে হবে এ মেয়েটার ? অথবা সে কি আবার বিয়ে করবে! নাকি সারা জীবন সাদা শাড়ি পরে কাটিয়ে দেবে! কি জানি স্বামী শোকে আতœ হত্যা ও করতে পারে। এ রকম না চিন্তা আসে মজিদের মনে। তাকে দেখে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল মহিলারা। দরজা লাগানোর শব্দ এক ধরণের ঘৃণা হয়ে আঘাত করলো তাকে। একজন রাজাকের হয়তো আরেকটু বেশী ঘৃণাই প্রাপ্য। খুব একটা খারাপ লাগালো না তার। সে তো আসলে একজন রাজাকার বেশী মুক্তিযোদ্ধা। পরদিন আবার রাজাকার বেশে ক্যাম্পে গেল মজিদ একটা সংবাদ শুনে তার বুকের ভেতর ধড়পড় করে উঠলো। কিছুক্ষণ পরেই পাকবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ঘাটিতে হামলা করবে। যেখনে রয়েছে তার ছোট ভাই সহ নয় জন মুক্তিযোদ্ধা। এই মুহুর্তে তাদের নিকটে খবর পৌছানো দরকার কিন্তু তার কোন উপায় নেই। পাকসেনাদের গাড়ি রেড়ি হওয়ার আগেই দ্রুত বাসায় পৌছে সে। নিজের এল .এম জি টা নিয়ে অবস্থান নেয় পাকসেনাদের পথের পাশে খালের মধ্যে। খাল ভর্তি পানা সেনাবাহিনীর গাড়ি কাছাকাছি আসতেই পানার ভেতর থেকেই গুলি ছুড়তে থাকে সে। গাড়ির ভেতর থেকে সেনাবাহিনীরা গুলি ছোড়ে। অনেক্ষণ গুলি বিনিময়ের পর এসময় মিলিটারিরা পিচু হটতে বাধ্য হয় তারা। নিজের জীবন বাজি রেখে নয় জন মুক্তিযোদ্ধার জীবন বাঁচিয়েছে সে। ভাবতেই খুব ভালো লাগে তার।
এল .এম .জি হাতে সে দ্রুত ছুটে আছে ছোট ভাই আবুল কালামদের নিকট। খবরটা দিতেই তারা দ্রুত সরে পড়ে। কিন্তু এতক্ষণে পাকবাহিনীর কাছে হয়তো তার রহস্য ফাঁস হয়ে গেছে। বাড়ি ফিরতে গেলে বিপদ হতে পারে। তা ছাড়া আজ একা যুদ্ধ করার পর যুদ্ধের নেশা পেয়ে বসে তাকে। এখান থেকেই সে যোগ দেয় মুক্তি যোদ্ধাদের দলে। গ্রুপ ভিন্ন হওয়ায় ছোট ভাইয়ের সাথে আর তার দেখা হয় না। বাবা-মা কেমন আছে তাও জানেনা সে। তার রক্তে এখন শুধু যুদ্ধের নেশা।
শুরু হয় গেরিলা যুদ্ধ। কখনো কখনো ভয়ংকর পরিস্থিতির স্বীকার হতে হয় তাদের। একদিন হঠাৎ পাকবাহিনীর মুখোমুখি হয়ে যায় তারা সাথে সাথে তারা শুয়ে পড়ে গুলি করা শুরু করে। শহীদ হয় তাদের দলের দশজন সদস্য। দশজনের একজন বাদল যার সাথে যুদ্ধ করতে এসে বন্ধুত্ব হয় তার। সবচেয়ে কাছের বন্ধুটিকে নিজের হাতেই সমাহিত করে সে। অনেক স্বপ্ন ছিল। বাদলের যে দিন দেশ স্বাধীন হবে সে দিনই বিয়ে করবে সে। তার অপেক্ষায় বসে আছে গ্রামের সহজ সরল এক কিশোরী নাম মালা। বাদল বলেছিল যদি তার কিছু হয়ে যায় তাহলে যাতে মালার কাছে সংবাদটা পৌছায়।
মালা বলেছিল বাদল ছাড়া আর কাউকে সে বিয়ে করবেনা। সে হয়তো সারা জীবন বাদলের পথ চেয়ে বসে থাকবে। কিন্তু মালার কাছে সংবাদটা পৌছাতে পারেনি বাদল। তার ধারণা অপেক্ষায় থাকলেই ভালো। বাদলের মৃত্যুর খবর যদি সে সহ্য করতে না পারে। আর মজিদই বা কিভাবে তাকে খবরটা দেবে।
দীর্ঘ যুদ্ধে পর অবশেষে ১৬ ই ডিসেম্বর বহুল প্রতিক্ষিত বিজয় আসলো। হ্যাঁ আজ বাংলাদেশ স্বাধীন। আজ বাংলার আকাশ অনেক প্রশস্ত। দীর্ঘ দিন ঠিক মত খাওয়া হয়নি। ঠিক মত ঘুম হয়নি। অনেক ক্নান্ত সে। কিন্তু বিজয়ের আনন্দ তার সব ক্লান্তিকে ঢেকে দিয়েছে। বাড়িতে ফিরে আসে সে। বাড়ির সামনে আসতেই অপ্রস্তুত যায় মজিদ। কোথায় তার বাড়ি। কোথায় তার বাবা-মা, বোন? তবে কি পাকবাহিনী তাদের বাড়ি উড়িয়ে দিয়েছিল। তার বাবা-মা, বোন সবাই কে হত্যা করেছিল। কোথায় তার ছোট ভাই আবুল কালাম? সে কি আদৌ বেঁচে আছে? নাকি তাকে ও ...........আর ভাবতে পারেনা সে।
চিৎকার করে কেঁদে উঠে মজিদ। সে চিৎকার হারিয়ে যায় দিগন্তে। আজ সে মুক্ত সত্যিই মুক্ত পাকবাহিনীর ছায়া থেকে মুক্ত পৃথিবীর সব বন্ধন সব মায়া মমতা থেকেও।
.jpg)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন