মঙ্গলবার, ১৭ জুন, ২০১৪

টাইমস নিউজ২৪ এ প্রকাশিত আমার একটি (কাঁচা হাতের লেখা) গল্প


আতিক রাসেল
1557623_48076টাইমসনিউজ২৪ডটকম: মেয়েটা এখনো
 ফিরছেনা কেন? ও তো কোন সময়
 দেরী করে বাসায় ফেরে না।
 পথে কি কোন সমস্যা হলো?
 একবার কলেজের দিকে গেলে ভালো হয়না
? না তার দরকার হবেনা।
 যে কোন খারাপ পরিস্থিতি আমার
 মেয়ে নিজেই মোকাবেলা 
করতে পারবে।
 আমার মেয়েকে ছোট বেলা থেকে আমি সেভাবেই তৈরী করেছি।
 তবুও কেমন জানি অস্থির লাগছে গফুর সাহেবের কাছে।
গফুর সাহেব অবসর প্রাপ্ত সচিব। সরকারী চাকরির কারণে
 নানা জায়গায় বদলি হতে হয়েছে। জীবনের শুরুতে যখন তিনি
 লেখা পড়া করতেন তখনও তার পিতা তাকে একেকবার একেক স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন।
 তার প্রাইমারি জীবন কেটেছে দেশের এক প্রান্তে তো মাধ্যমিক জীবন কেটেছে দেশের 
আরেক প্রান্তে আবার উচ্চ মাধ্যমিক জীবন কেটেছে অন্য প্রান্তে। এভাবেই দেশের কোন
 জায়গায় তার পাঁছ ছয় বছরের বেশী থাকা হয়নি।
চাকরি পাওয়ার পর থেকে শুরু হয়েছে আরেক সংকটময় অবস্থা। বাংলাদেশের সরকারি অফিসার গুলোকে প্রায়ই বদলি হতে হয়। সৎ পথে থাকতে গেলে তো কথাই নেই, উপরের নির্দেশে বদলি হতে হবেই। এই উপরটাকে আসলে কারা নিয়ন্ত্রন করেন গফুর সাহেব  তা কোন দিন ভেবে দেখেননি। অযথা জীবনটা দেয়ার দরকার কি? একটা জীবন তো শুধু একা চলেনা একে ঘিরে বয়ে চলে আরও কিছু জীবন।
দেশের অসংখ্য অঞ্চলে তাকে জীবন যাপন করতে হয়েছে। সিলেটে এসেছেন এখন প্রায় চার বছর হতে চললো। এখানে এসে গফুর সাহেবের কাছে বেশ ভালোই লাগছে। ভাবছেন এ শহরেই কাটিয়ে দেবেন বাকী জীবনটা।
বাবা….।
মেয়ের ডাক শুনতেই অনন্দে বুকটা ভরে ওঠে তার । মেয়েটা হয়েছে বেশ আহ্লাদি এত্ত সুন্দর করে বাবা বলে ডাক দেয় খুশিতে মনটা ভরে উঠে। বড় একটা দম নেন তিনি। এত দেরী করলি যে?এই বাবা মাত্র আধা ঘন্টা। দেড়টায় ফেরার কথা এখন দুটো বাজে।তোর কাছে আধা ঘন্টা খুব সামান্য। কিন্তু আমার কাছে আধা ঘন্টা অনেক সময়।
আজকাল রাস্তাঘাটে যা অবস্থা। তোদের কলেজে পাঠিয়েই আমাদেরকে চিন্তিত থাকতে হয়। তারপর পাঁচ মিনিট লেট হলেই অস্থিরতা শুরু হয়। আমার মেয়েটা কোন সমস্যায় পড়লোনা তো………।
বাবা কলেজ থেকে ফেরার পথে আঁখিদের বাসায় গিয়ে ছিলাম ওর নোট গুলো আনতে।
আঁখির আম্মুটাযে কী! কাছে পেলেই বুকে জড়িয়ে ধরবে। আমি নাকি তার আরেকটা মেয়ে। এজন্যই একটু দেরী হয়ে গেলো। আমাকে নিয়ে এত ভাবো কেন বাবা আমি তোমার মেয়েনা। তোমার আদর্শে বড় হয়েছি না! আমাকে কেউ টিজ করতে আসবেনা। বাবা, যারা ইভটিজিং করে তারাও মানুষ দেখে করে। তোমার কথা খারাপ ধরণের মেয়েনা তাকে কেউ টিজ করার সহস করবেনা।
কী ব্যাপার বাবা কথা বলছনা কেন ?
বাবা… বাবা…। আঁখির মা তোকে মেয়ে বলে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল নারে ?
হ্যাঁ।
মাঝে মাঝে তোর মায়ের কথা খুব মনে পড়ে না ?
ওহ বাবা তুমি কি! আমি তো শুধু কলেজ থেকে ফিরতে দেরী হওয়ার কারণটা বলেছি। আর তুমি।………….তুমিই তো আমার মা, তুমিই তো আমার বাবা। আমার মত সৌভাগ্য আর কয়টা মেয়ের আছে। যারা তোমার মত বাবা পেয়েছে। বলতে বলতে দুই জনেরই গাল দুটো অশ্রুতে প্লাবিত হয়ে যায়।
কথা ফ্রেশ হয়ে বাবাকে ডাকে। বাবা খেতে এসো। কথা বাবার প্লেটে ভাত উঠিয়ে দিচ্ছে তরকারি উঠিয়ে দিল। ওষধ গুলো নিজ হাতে খাইয়ে দিল। বিছানা ঠিক করে দিল। বাবা শোয়ার পরেও কথা অনেক্ষন তার মাথার পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। গফুর সাহেব মুছকি হাঁসেন। আমার মা আমাকে ঘুম পাড়াচ্ছে ? কথাও হাঁসে। বাবার ঘুমালে সে নিজের ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
বিকেল হলেই কথা আঙ্গিনায় বেরিয়ে পড়ে। নিজের তার ছোট একটা বাগান আছে তার পরিচর্যা করে। গফুর সাহেব নিজেও এগুলোর দেখা শোনা করেন। যেখানেই থাকেন বাবা মেয়ে মিলে খুব সুন্দর একটা পরিবেশ তৈরী করেন ওখানে। বেলা ডুবতেই নামায কালাম পড়ে আবার পড়তে বসা।এভাবেই কাটে কথার দৈনন্দিন জীবন।
কথা কলেজে যেতেই বাসার ফোনটি বেজে উঠে। গফুর সাহেব ফোন ধরতেন অপর প্রান্ত থেকে অপরিচিত কেউ একজন বলল কেমন আছেন? ভালো কিন্তু কে?
আমি কে সেটা পরে জানবেন কিন্তু আপনার মেয়ে কলেজের নাম করে কোথায় যায় কি করে তার খবর রাখেন ? মেজাজটা শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রন হারালো। প্রচন্ড জোরে একটা ধমক দেন তিনি। জানোয়ার আমার মেয়ে সম্বন্ধে এমন মন্তব্য করার সাহস তোকে কে দিয়েছে। লাইনটা কেটে যায় অপর প্রান্ত থেকে কি বলতে চাচ্ছিল তা পুরোপুরি শোনা হয়না তিনি শুনতে চাচ্ছিলেন ও না।
দুপুর বেলা বাবা মেয়ে একসাথে ভাত খাচ্ছে। তুই কলেজে যাওয়ার পর একটা ফোন আসছিল। লোকটা তোর সম্বন্ধে কিছু একটা বলতে চাচ্ছিল।ওহ বাবা বুঝতে পেরেছি ছেলেটার নাম আসগর। কয়েকদিন ধরে আমার পেছনে ঘুর ঘুর করছিল। ব্যর্থ হয়ে হয়তো এ কাজটা করেছে। দুপুরে খাবার পরে বিশ্রাম নেন গফুর সাহেব কিন্তু সকাল বেলার ফোনটা মাথা থেকে নামাতে পারেননা। ভাবেন মেয়েটার বয়স হয়েছে আর কত এবার তাকে বিয়ে দেয়া দরকার। বন্ধু বান্ধবদের খবর দিয়ে মেয়ের জন্য পাত্র দেখতে বললেন।
কিছু দিনের মধ্যে একটা ভালো পাত্র গেল। পুরোনো বন্ধু মজিদ সাহেবের ছেলে এ বছর লন্ডন থেকে পি.এইচ.ডি করে এসেছে। দুপুরে খাবার টেবিলে বসে মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দিতেই সে কাঁদতে শুরু করল। এত তাড়াতাড়ি পর করে দেবে বাবা। আমি তোমাকে ছেড়ে কেত্থাও যাবোনা। আমি চলে গেলে তোমাকে কে দেখবে।কিন্তু মা, ছেলে মেয়ে বড় হলে তাকে বিয়ে দেয়া বা মায়ের কর্তব্য হয়ে যায়। আমাকে আমার কর্তব্য পালন করতে দে।
এক মাত্র মেয়ের বিয়ে বেশ ঘটা করেই আয়োজন করা হলো। কথাকে বিদায় দিতে হবে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো কথা। একটু ও কাঁদলেননা গফুর সাহেব। মেয়েকে বিদায় দিয়ে বাসায় ফিরলেন তিনি। সন্ধ্যা নেমে এসেছে বাড়িতে। কিন্তু আজকের সন্ধ্যাটা একটু বেশি লগছে তার ঘওে ঢুকে হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলেন। ঘরটা কেমন যেন ভুতুড়ে মনে হচ্ছে। বুকের মাঝে কেমন যেন একটা শুন্যতা অনুভব করলেন তিনি। মনে হলো তার কেউ নেই কিচ্ছু নেই।
আজ নিজেকে তার বড় একা লাগছে। আজ থেকে আর কেউ বাবা……………. বলে ডাক দিবেনা। সেই একটি বাবা ডাক যেটা তাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল স্ত্রীকে হারানোর কষ্ট। আজ কথার মাকে বড় বেশি মনে পড়ছে তার। সে মারা যাবার সময় মেয়েটা কøাশ ফাইভে পড়ে। দ্বিতীয় মা সব সময় ভালো হয়না। যদি তাতে কথার কষ্ট হয় এইভেবে দ্বিতীয় বিয়েটা করেননি তিনি। জীবনে এই প্রথম নিজেকে তার বড় একা একা লাগছে।
লেখক: সভাপতি- হাতিয়া সাহিত্য পরিষদ

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন