হাতিয়া বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণে অবস্থিত একটি দ্বীপ। মূল ভুখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন বলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা তাৎক্ষনিক ভাবে পাওয়া যায়না।চারিদিকে জলভাগ এবং বন। এসব সুবিধাকে পুঁজি করেই এখানে গড়ে উঠেছে দস্যুদের আস্তানা। হাতিয়ার উত্তর অঞ্চল ভেঙ্গে গিয়েছিল অনেক আগেই।নতুন করে এখানে গজিয়েছে বয়ার চর,নলীর চর,চর নঙ্গলিয়া,কেয়ারিং চর,মৌলভীর চর,ঢাল চর জাগলার চর। দক্ষিন অঞ্চলে আছে দমার চর কালাম চর বন্দর টিলা,বাউলার চর। এসব চরাঞ্চলে মানুষের বসতি স্থাপন শুরু হলে বয়ার চরে দখল নেয় রেনু মেম্বার এবং জাহাঙ্গির নেতা।
চরে নিজেদেও আধিপত্য বিস্তরের লক্ষ্যে তারা গড়ে তোলে নিজস্ব বাহিনী। তারা তাদের বাহিনীকে চট্রগ্রামের গৈরা এবং স্বন্দীপের দস্যুদের থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে প্রশিক্ষণ দেয়। হতিয়ার নদী ভাঙ্গা গরীব লোকজন বয়ার চরে বসতি স্থাপন করতে আসলে এখানকার জমির উপর ট্যাক্্র ধার্য করে এই বাহিনী। তারা প্রতি বার গন্ডা জমিকে এক দাগ হিসেবে ভাগ করে দরিদ্র মানুষ থেকে বিক্রি করতো। একি দাগ তিন চার জনের কাছে বিক্রি করতো বলে টাকা দিয়ে ও দরিদ্র কৃষকরা তাদের দাগ খুঁজে পেতোনা নিজেরাই রক্তাক্ত হতো।দাগ বিক্রি শেষ তারা নতুন ভাবে বসতি স্থাপন করা লোকজন থেকে ট্যাক্স নেয়া শুরু করে। এরপর স্থানীয় এম.পি ফজলুল আজিমের তত্ত্বাবধানে প্রসাসন এবং স্থানীয় লোকজন চরকে ডকাতমুক্ত করার সংগ্রামে নামে এতে নিহত হয় অসংখ্য সাধারণ জনগন।ডাকতরা জীবন্ত কবরদেয় অনেক লোককে।স্থানীয় লোকজনের ভাষায় এটা ছিল তাদেও দ্বিতীয় মুক্তি যুদ্ধ। জনগন ও প্রসাশণের যৌথ সহয়তায় শেষ হয় রেনু মেম্বার এবং জাহাঙ্গীর অধ্যায়। এর পর শুরু হয় বাশার মাঝি নামে নতুন অধ্যায়। র্যাবের যৌথ অভিযানে বাশার মাঝি নিহত হয়। তবু থামেনি ডাকাতদের দৌরাত্ব। নতুন ভাবে ডাকাত দলের দায়িত্ব নেয় কালাবাদশা,মুন্সিয়া চোরা,ইব্রাহীম ডাকাত,মাসুদ বাহিনী,পিচ্ছিখোকা,ও নাসির।মুন্সি বাহিনীর হাতে ইব্রাহীম নিহত হওয়ার পর গত ৬ই জুন আততায়ীর হাতে নিহত হয় মুন্সিয়া চোরা। এখনো থেমে নেই হাতিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ডাকাতদের কর্মকাণ্ড। হাতিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বাহার,হকসাব মুজিদ,রফিক কমান্ডার,শামছুল্লা চোরা,আব্দুর রহিম চর গজারিয়ার অজি উল্লাহ ডাকাত ও আব্দুর রব ডাকাত সহ আরো অনেকে।
কালাম
চরে মুন্সি বাহিনীর উত্তরসুরীরা
আর উত্তরাঞ্চলে এখন রাজত্ব নিজাম
ডাকাতের।
সমপ্রতি
চর দখলকে কেন্দ্র করে
নিজাম ডাকাত ও মুন্সি
বাহিনীর মধ্যে কয়েকটি রক্তক্ষয়ী
সংঘর্ষে নিহত হয় শত
শত ডাকাত ও সাধারন
মানুষ সাপ্তাহিক রেনেসার পক্ষ থেকে জেলেদের
কাছে জানতে চাওয়া হলে
তারা জানান বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ
করতে হলে অবশ্যই কালাম
চর সংলগ্ন মোকতাইরার খাল
পার হতে হয়।
আর এ পথ দিয়েই
পার হয় হাতিয়া মনপুরা,রামগতি,চরফ্যাশন সহ
বিভিন্ন উপকুলের জেলেরা। মাছ
শিকার করে আসার পথে
তাদেরকে পড়তে হয় কালাম
চরে থাকা দস্যু বাহিনীর
কবলে।
এবারে দেখা যাক
২০১১ সালে হাতিয়ায় ডাকাতির
একটি খন্ড চিত্র
১৮ই জানুয়ারী দ্বীপ
উপজেলা হাতিয়ায় চরবাশারের দস্যুদের গুলিতে ভূমিহীন গিয়াস
উদ্দিন (৪২), রায়হান (০৯),
মাইন উদ্দিন (৮৫), লিটন (৩৫),
আব্দুল জলিল ওরফে আর্মি
(৪২) ও ভূট্টু (৩৮)সহ ১০জনকে হত্যা
করে। তবে
নিহত এসব জেলেদের লাশের
সন্দান পায়নি তার স্বজনেরা। এছাড়াও
জলদস্যুরা এর আগের বছরের
১৪ অক্টোবর ইব্রাহীম সরদার (৫০), কামাল
উদ্দিন, আবুল খালেক, বেলাল
উদ্দিন, আফছার উদ্দিন, দুলাল
উদ্দিন ও রফিক উদ্দিনকে
হত্যা করে।
২০১০ সালের ২৪ নভেম্বর
মেঘনায় জলদস্যুদের গুলিতে নিহত ইব্রাহীম
কেরানীর স্ত্রী আমেনা খাতুন
বাদি হয়ে চলতি বছরের
১৪ এপ্রিল হাতিয়া নির্বাহী
ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে সাবেক এমটি
মোহাম্মদ আলীকেসহ ৩০ জনের নামে
একটি হত্যা মামলা দাখিল
করেন। ১০
মে মঙ্গলবার মেঘনার জলদস্যু নিজাম
ডাকাত ও নাছির গ্রুপের
মধ্যে বন্দুক যুদ্ধে স্থানীয়
বাসিন্দা জামাল বাতাইন্না (৫৫)
নিহত ও সিরাজ কমান্ডার
(৩৮), আজহার কমান্ডার (৩৫)
এবং ফরিক কমান্ডার (২৭)
নামে তিন দস্যু গুলিবিদ্ধ
হয়।
২ জুলাই বৃহস্পতিবার সকাল
থেকে দুপুর পর্যন্ত মেঘনায়
জলদস্যু মুন্সিয়া বাহিনী ও নিজাম
ডকাত গ্রুপের মধ্যে বন্দুক যুদ্ধে
৮ দস্যু নিহত হয়েছে।
৩ জুলাই রবিবার সকালে
জলদস্যুরা মেঘনার বিভিন্ন স্থানে
তান্ডব চালিয়ে ৩০ মাছ
ধরা ট্রলারসহ ৩ শতাধিক জেলে
অপহরণ হয়েছে। পরদিন
সোমবার একই দস্যুরা আবারও
তান্ডব চালিয়ে ৫০ মাঝি-
মাল্লাকে অপহরণ কের।
১৮ জুলাই মেঘনা নদী
থেকে গলাকাটা এক অজ্ঞাত যুবকের
লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ
১৫ আগস্ট সোমবার সকালে
জলদস্যু নিজাম ডাকাত উপজেলার
নলিরচরের জনতা বাজার থেকে
নলির চরের প্রশাসনিক মেম্বার
আব্দুল খালেককে (৬৫) আপহরণ করে
নিয়ে যায়। পরে
পুলিশের সহযোগিতায় ছাড়া পায় খালেক
মেম্বার। ১৭
আগস্ট বুধবার জলদস্যুদের হামলায়
৫ জেলে আহত হয়েছে। এসময়
জলদস্যুরা মাছ-জলসহ প্রায়
৫লক্ষাধিক মালামাল লুট করে।
২০ আগস্ট শনিবার রাতে
মেঘনা নদী থেকে জলদস্যুরা
৬টি মাছ ধরা ট্রলার
আপহরণ করে। অপহরণকৃত
ট্রলারগুলোর জন্য মুক্তিপণ নিয়েও
ট্রলার মালিকদেরকে আজ পর্যন্ত তা
ফিরিয়ে দেয়নি দস্যুরা।
১১ সেপ্টেম্বর মেঘনার জলদস্যু স¤্রাট নাছির কেরানী
র্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত
হয়েছে বলে নাছির কেরানীর
পরিবার দাবী করলেও র্যাব তা অস্বিকার
করে। এ
পর্যন্ত নাছির কেনারীর কোন
সন্ধান পাওয়া যায়নি।
নাছির কেরানীর বিলুপ্তিতে তার গ্রুপ চত্রভঙ্গ
হয়ে গেছে। ফলে
তার বাহিনীর অত্যাচার থেকে হাতিয়াবাসী কিছুটা
শস্তিপেলও থেকে নেই অপর
জলদস্যু নিজাম গ্রুপ।
৩ আগস্ট বুধবার দুপুরে
একই দস্যুরা চাঁদার দাবীতে বয়ারচর
মাইন উদ্দিন বাজার এলাকার
ভূমিহীন সাদ্দাম হোসেনকে অপহরণ করে হাত
কেটে দেয়। একই
দিন নলেরচর ভূমিহীন বাজার
এলাকার মিরাজ উদ্দিন আবু
জাফর, আব্দুল মতিনসহ কয়েক
জন ভূমিহীনকে অপহরণ করে নিয়ে
যায়। এদের
মধ্যে দস্যুরা সাদ্দাম ও সেলিমের হাত
কেটে দিয়েছে। ১৪
অক্টোবর মেঘনায় ৭ জেলেসহ
ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটেছে।
১০ ডিসেম্বর শনিবার গভীর রাতে
উপজেলা কালাম চরে জলদস্যুদের
দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে বহু
জলদস্যু নিহত হলেও তাদের
লাশ পাওয়া যায়নি।
একই দিন উপজেলা চেয়ারম্যান
ঘাট সংলগ্ন মেঘনা নদী
থেকে অজ্ঞাত পরিচয়ের এক
যুবকের লাশ উদ্ধার করেছে
পুলিশ। স্থানীয়
জেলেরা বলছেন, দস্যুরা লাশগুলোর
পেট কেটে নদীতে ভাসিয়ে
দিয়েছে। ১২ই
ডিসেম্বর হাতিয়া উপজেলায় চাঁদার
দাবিতে চর কালামে নিজাম
ডাকাত ও তার বাহিনীরা
কৃষকের বাড়ীতে হামলা করে
হারিছ মাঝি (৩৫), বেলাল
মাঝি (৩০) ও খোরশেদ
মাঝি (৪৫) কে কুপিয়ে
হত্যা করে। ২৯ই
ডিসেম্বর হাতিয়া উপজেলার সোনাদিয়া
ইউনিয়নের চরচেঙ্গা খালের মাথায় ভাসমান
এক যুবকের লাশ দেখতে
পায় স্থানীয় জেলেরা। লাশটির
খবর পুলিশকে জানানো হলেও তা
উদ্ধার করেনি পুলিশ।
এ সকল হত্যা কান্ড
এবং গত বছরের আইন
শৃংখলা পর্যালোচনা বিষয়ে হাতিয়া থানার
ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোকতার হোসেন বলেন,
‘অতীতের যে কোন সময়ের
ছেয়ে বর্তমানে হাতিয়ার আইন শৃঙ্খলা অনেক
ভালো আছে। জলদস্যু-
বনদস্যুদেরকে গ্রেফতার করার জন্য আমাদের
অভিযান অব্যাহত আছে। যে
কোন পরিস্থিতি মোকাবেলায় পুলিশ তৎপর রয়েছে।’
।
সম্প্রতি
হাতিয়ার মোকতাইরার খাল ছাড়াও বিভিন্ন
নদীতে ডাকতের দৌরাত্ব আশংকা
জনক ভাবে বেড়েছে।
এ ব্যাপারে হাতিয়ার বর্তমান এম.পি.প্রকৌশলী
ফজলুল আজিমের সঙ্গে সাপ্তাহিক
রেনেসাঁর সাক্ষাৎকারের উল্লেখ যোগ্য কিছু
তুলে ধরা হলো।
সাপ্তাহিক
রেনেসাঁ : জলদস্যু বর্তমানে হাতিয়ার প্রধাণ সমস্যা এব্যাপারে
আপনার মন্তব্য কী?
ফজলুল
আজিমঃ জলদস্যু আসলেই হাতিয়ার প্রধাণ
সমস্যা। হাতিয়ার
চারিদিকে রয়ছে মেঘনা নদী। এই
নদী এখানকার অধিকাংশ মানুষের জীবন ধারনের উৎস। কিন্তু
জলদস্যুদের ভয়ে জেলেরা ঠিক
মত নদীতে মাছ ধরতে
পারছেনা। এতে
তাদের জীবন যাত্রা ব্যাহত
হচ্ছে। হাতিয়া
থেকে গলদাচিংড়ি,বাগদা চিংড়ি,ইলিশ
সহ বিভিন্ন মাছ রপ্তানি সরকারি
আয়ের অন্যতম উৎস।
জলদস্যুদের কারণে এ খাতে
যথাযথ উন্নতি ব্যহত হচ্ছে। এছাড়া
নিবিচারে গাছ কেটে তারা
কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ
ধ্বংশের পাশাপাশি প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে।
ভুমিহীন কৃষকরা চাষাবাদ করে
সামান্য যা আয় করছে
তার অধিকাংশই ডাকাতদের দিতে হচ্ছে।
সাপ্তাহিক
রেনেসাঁ ঃ গত দুই
সেশন পর পর এম.পি.হিসেবে নির্বাচিত
হয়ে আসছেন;আপনার এলাকাকে
জলদস্যু মুক্ত করতে আপনি
কী কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?
ফজলুল
আজিমঃ বয়ার চর, নঙ্গলিয়ার
চরে পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন
আমার প্রচেষ্টায় হয়েছে।এর
মাধ্যমে আইন শৃংখলা পরিস্থিতির
অনেক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। এছাড়া
র্যাবের দ্বারা বিভিন্ন
সময় অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে
অনেক গ্যাং সহ দলনেতাদের
গ্রেপ্তার করার ব্যবস্থা করেছি। হাতিয়ার
অবস্থান গত কারণে এখানে
ব্যাপক পুলিশ ও র্যাব মোতায়েন করা
না হলে আইন শৃঙ্খলা
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব নয়। এ
বিষয়টি আমি অনেক বার
সংসদে উপস্থাপন করেছি। সরকারের
সহযোগিতা যতটা পাওয়া দরকার
ছিল ততটা পাইনি।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন